মারিয়ানা ট্রেঞ্চ: পৃথিবীর গভীরতম স্থান

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ: পৃথিবীর গভীরতম স্থান

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ: পৃথিবীর গভীরতম স্থান
মারিয়ানা ট্রেঞ্চ: পৃথিবীর গভীরতম স্থান


আপনি কি জানেন পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম স্থান। আপনি হয়তো জানেন না সেখানেও মানুষের অবতরণ ঘটেছে। আকাশ কিংবা সমুদ্রের তলদেশ। বিজ্ঞানীরা অনেক জায়গায় পৌঁছে গেছেন। আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে। চলুন জেনে নেই, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর এবং রহস্যময় জায়গা কেন অদ্ভুত এবং ভয়ানক।

আপনাকে যদি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কোনটি, এই প্রশ্নটি করা হয় তবে আমি নিশ্চিত আপনি তৎক্ষণাৎ উত্তরটি বলবেন -“মাউন্ট এভারেস্ট”। কিন্তু আপনি কি জানেন পৃথিবীর গভীরতম স্থান কোনটি এবং কোথায় এটি অবস্থিত?



পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ৮৮৫০ মিটার বা ২৯০৩৫ ফিট যা নেপাল ও চীনের সীমান্তরেখায় অবস্থিত। অপরদিকে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত পৃথিবীর গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা প্রায় ১১,০৩৪ মিটার (৩৬,২০১ ফিট) অর্থাৎ প্রায় ৭ মাইলের সমান! অর্থাৎ পুরো মাউন্টcএভারেস্টকেও যদি তুলে এনে এই জায়গায় ডুবিয়ে দেয়া হয় তারপরও এভারেস্ট শীর্ষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২১৩৩ মিটার (৭০০০ ফিট) নিচে থাকবে!


মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের (Mariana Island) ঠিক পূর্বে অবস্থিত। মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের নামানুসারে এই সমুদ্রখাদটিকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ নামকরণ করা হয়েছ। প্যাসিফিক প্লেট (Pacific Plate) এবং মারিয়ানা প্লেটের (Mariana Plate) সংঘর্ষে অধোগমন (Subduction) নামক এক ভৌগোলিক প্রক্রিয়ায় এই খাতটি তৈরি হয়েছে যা একটি বৃত্তচাপের আকারে উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ২৫৫০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এর গড় বিস্তার প্রায় ৭০ কিলোমিটার।


মারিয়া ট্রেঞ্চ এর গভীরতম অংশটির নাম চ্যালেঞ্জার ডিপ (Challenger Deep) যেটি গুয়াম দ্বীপের (Guam Island) ৩৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। চ্যালেঞ্জার ডিপ নামটি রাখা হয়েছে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ HMS Challenger এর নামানুসারে কেননা এই জাহাজের নাবিকরা এই অংশটি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। ১৮৭৫ সালের অভিযানের পর ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ জাহাজ H.M.S Challenger II প্রতিধ্বনি (Echo-Sounder) প্রযুক্তির মাধ্যমে এই গভীরতা পরিমাপ করে যা ১১ কিলোমিটারের (৭ মাইল) সমান!


মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা এতটাই বেশি যে এই জায়গাটা চির অন্ধকার এবং এটিই সাগরতলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার স্থান। এছাড়াও, পানির চাপ এতটাই যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের স্বাভাবিক বায়ুচাপের তুলনায় তা ১০০০ গুণেরও বেশি! এ কারণেই এখানে স্বাভাবিকের চেয়ে পানির ঘনত্বও প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এতসব প্রতিকূলতার কারণে চ্যালেঞ্জার ডিপে মানুষের অবতরণ সহজ ছিল না।


আজ থেকে ৫০ বছর আগে প্রথমবারের মতো চ্যালেঞ্জার ডিপে মানুষের অবতরণ হয়। ১৯৬০ সালে জ্যাক পিচার্ড (Jacques Piccard) এবং নৌবাহিনী লেফটেন্যান্ট ডন ওয়ালশ (Navy Lt. Don Walsh) ট্রিয়েস্ট (Trieste) নামক গভীর সমুদ্র তলে অনুসন্ধান যোগ্য জলযানে(Submersible) করে চ্যালেঞ্জার ডিপে পৌঁছান।


মারিয়ানা ট্রেঞ্চে অবতরণঃ

তাদের এই অবতরণে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগে এবং তারা মাত্র ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষ, পলি দ্বারা সেখানকার পানি এতটাই ঘোলা হয়ে গিয়েছিলো যে তাদের পক্ষে সেখানকার কোনো ছবি তোলাও সম্ভব হয়নি।


সম্প্রতি ২০২১ সালের পহেলা মার্চ রিচার্ড গেরিয়ট (Richard Garriott) চ্যালেঞ্জার ডিপে অবতরণ করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি বনে যান পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি যিনি একই সাথে পৃথিবীর উভয় মেরু, মহাকাশ এবং পৃথিবীর গভীরতম স্থানে গিয়েছেন। লিমিটিং ফ্যাক্টর (Limiting Factor) নামক জলযানে করে তাদের এই অভিযানটি ছিল প্রায় ১২ ঘন্টার! চ্যালেঞ্জার ডিপে অবতরণে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল, চারঘন্টা তারা সেখানে অবস্থান করেছিলেন এবং চার ঘণ্টা সময় ফিরে আসতে ব্যয় হয়েছে।


পিচার্ড এবং ওয়ালশের এই অবতরণের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এত উচ্চচাপে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের অভ্যন্তরে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু ট্রেঞ্চে অবতরণের পর ট্রিয়েস্টের ফ্লাডলাইটে আলোতে পিচার্ড ফ্লাটফিশ (Flatfish) এর মতো প্রাণী দেখেছিলেন যেটি সম্পর্কে পরবর্তীতে তিনি তাঁর এই অভিযান বিষয়ক একটি বইয়ে বর্ণনা করেন। কয়েক দশক ধরে জীববিজ্ঞানীদের করা প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর হিসেবে পিচার্ড লিখেছেন,


পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রখাদে প্রাণের অস্তিত্ব কি থাকতে পারে? হ্যাঁ, অবশ্যই পারে।

পিচার্ডের বর্ণনা অনুযায়ী এত উচ্চচাপে সেখানে আসলেই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কিনা সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করেছিলেন। তবে প্রকৃতি এর অভিযোজনের অসাধারণ ক্ষমতার দরুণ বিজ্ঞানীদের এর আগেও বহুবার ভুল প্রমাণিত করেছে।


রিচার্ড গেরিয়ট তার সাম্প্রতিক অভিযানে চ্যালেঞ্জার ডিপের তলদেশে ক্রাস্টেশিয়ান উপপর্বের (Crustaceans) প্রাণী দেখেছিলেন যা থেকে সেখানে অন্যান্য আরো জৈব পদার্থের উপস্থিতির ধারণা পাওয়া যায়।


গেরিয়টের বিশ্বাস নতুন প্রজাতির অনেক প্রাণের অস্তিত্ব এখানে পাওয়া যাবে যেগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই বিশ্ববাসীর। সাধারণত সমুদ্রতলের গভীরে মৃত প্রাণীর কঙ্কাল খোলস জমা পড়তে থাকে। মারিয়ানার তলও আলাদা নয়। এখানকার পানির রং সেজন্যই খানিকটা হলুদ।


মারিয়ানা ট্রেঞ্চ থেকে গেরিয়টের নিয়ে আসা গভীর জলের এবং মাটির নমুনা পরীক্ষা করে Scripps Institute সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছে। অর্থাৎ মানুষের অগোচরে থাকা এই জায়গাটাতেও প্লাস্টিক পৌঁছে গেছে!


মারিয়ানা ট্রেঞ্চে উপস্থিত আণুবীক্ষণিক জীবের উপর গবেষণা থেকে পৃথিবীতে জীবের উত্থান ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সেখানকার মাটি পর্যবেক্ষণ করে আমাদের পৃথিবীর একেবারে প্রথম দিককার অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এছাড়াও সেখানকার পাথর বা শিলা পর্যবেক্ষণ করলে ভূমিকম্প সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব ।


আপনিও আমাদের জানাতে পারেন। কোন ধরনের ভিডিও আপনার পছন্দ। বন্ধুরা কমেন্ট এর মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না । কোন রহস্যময় তথ্য আপনার ভালো লেগেছে । আর হ্যাঁ, এরকম রহস্য-রোমাঞ্চ ভরা,তথ্যবহুল ভিডিও পেতে, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে, পাশের বেল আইকনটি, বাজিয়ে দেবেন ,ভিডিও ছাড়ার সাথে সাথে, রহস্য-রোমাঞ্চ ভরা, ভিডিও আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। ধন্যবাদ সবাইকে ভালো থাকবেন….