রূহ কি এবং মৃত্যুর পর কোথায় থাকে?

রূহ কি এবং মৃত্যুর পর কোথায় থাকে?

রূহ কি এবং মৃত্যুর পর কোথায় থাকে?
রূহ কি এবং মৃত্যুর পর কোথায় থাকে?


মৃত্যুর পর মানুষকে কবরস্থ করা হয়। প্রচলিত অর্থে গর্তকেই কবর বলে। প্রকৃতপক্ষে কবর হচ্ছে ওই জায়গার নাম, যেখানে মানুষ আলমে বরজখে থাকে। মানুষ মারা যাওয়ার পর থেকে কিয়ামত সঙ্ঘটিত হওয়ার মধ্যবর্তী যে সময় রয়েছে, তা-ই আলমে বরজখ।


এই আলমে বরজখে মানুষ যেখানে থাকে, সেটাই তার জন্য কবর। মৃত্যুর পর কাউকে যদি সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়, সমুদ্রই তার কবর। বাঘ বা অন্য কোনো হিংস্র প্রাণীও যদি কাউকে গিলে ফেলে, ওই প্রাণীর পেটই তার জন্য কবর হবে। সেখানেই তার ওপর আজাব কিংবা নেয়ামতের ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে যায়। এ আল্লাহর এমন এক বিস্ময়কর ব্যবস্থাপনা, যাতে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি পৌঁছাতে অক্ষম।



একটা উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারি। ধরুন, কোনো ঘুমন্ত ব্যক্তি এমন দুঃস্বপ্ন দেখল যে, কেউ একজন তাকে আঘাত করছে। সেও তা অনুভব করছে। কিন্তু তার পার্শ্বস্থ জাগ্রত ব্যক্তিটি তা টের পায় না। ঘুমন্ত ব্যক্তিটি ঠিক যেভাবে কষ্ট অনুভব করতে পারে, তার পাশে থাকা জাগ্রতরা অনুভব করতে পারে না। অনুরূপ কবরে থাকা ব্যক্তির ওপর যা বয়ে যায়, তা অন্যরা অনুভব করতে পারে না। এটা আল্লাহর একটি রহস্য, রূহের সংযোগ দেহের সাথে এমনভাবে করে দেয়া হয়, যাতে মৃত ব্যক্তিটি আজাবের কষ্ট বা নেয়ামতের স্বাদ অনুভব করতে পারে।



মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তার দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হয়ে যায় না। সাময়িকভাবে ছিন্ন হলেও পুনরায় সংযোগ স্থাপন করে দেয়া হয়। কিন্তু সেই সংযোগ পার্থিব সংযোগের মতো নয়। যেমনভাবে জীবন্ত অবস্থায় পৃথিবীর সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠিত থাকে। কিন্তু এমনভাবে করে দেয়া হয়, যেন দেহটির সাথে রূহের বিশেষ সম্পর্ক বজায় থাকে।


যার ফলে মৃত ব্যক্তি আজাব ও নেয়ামত অনুভব করতে পারে। ইসলামের সহিহ আকিদা হলো, কেউ মারা গেলে আল্লাহ তায়ালা তার দেহের কোনো অঙ্গে বিশেষভাবে প্রাণ সঞ্চারিত করে দেন। এতে সে অনুভূতিশক্তি ফিরে পায়। এটা অপরিহার্য নয় যে, রূহটিকে পুরোপুরিভাবে দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। যার কারণে লাশটি নড়াচড়া, চলাফেরা করতে পারে, এমন কিছু নয়।



আমাদের আকিদা হলো, মুসলমানদের রূহ তাদের মর্যাদা অনুসারে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে। কারো কারো রূহ থাকে কবরে। কারো কারো থাকে জমজম কূপে। কারো আসমান-জমিনের মধ্যবর্তী কোথাও। কারো থাকে প্রথম আসমানে, কারো দ্বিতীয়, আবার কারো তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানে।


আবার কারো রূহ অবস্থান করে আলা ইল্লিয়্যিনে, এমনটাই এসেছে বিভিন্ন হাদিসে। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ: তার ‘শরহুস সুদুর বিশারহি হালিল্ মাওতা ওয়াল কুবুর’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে বেশ কিছু হাদিস একত্র করেছেন। সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করার চেষ্টা করছি।



উক্ত গ্রন্থের ২৬২-২৬৩ পৃষ্ঠায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: হতে এই হাদিসটি বর্ণিত আছে, তিনি বলেন : ‘নিঃসন্দেহে মানুষকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন থেকে প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যা তাকে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম থেকে তার ঠিকানা দেখানো হয়।’



উক্ত গ্রন্থের ২৩৭ পৃষ্ঠায় আরো আছে, হজরত আলী রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : ‘মুমিনদের রূহ জমজম কূপে রাখা হয়। অনুরূপ ২৩৬ পৃষ্ঠায় মুগিরা ইবনে আবদুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত : ‘মৃত ব্যক্তির রূহ আসমান এবং জমিনের মধ্যবর্তী স্থানে রাখা হয়। অতঃপর সেখান থেকে মৃত ব্যক্তির দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়।’



২৩৫ পৃষ্ঠায় হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত আছে, নবী করিম সা: ইরশাদ করেছেন : নিঃসন্দেহে মুমিনদের রূহসমূহ সপ্তম আসমানে থাকে। সেখান থেকে তাঁরা জান্নাতের দৃশ্যাবলি অবলোকন করেন।’
সুনানে আবু দাউদের ২৫২০ নং হাদিসে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, নবী কারিম সা: বলেছেন : ‘যখন তোমাদের কোনো ভাই মৃত্যুবরণ করে, তখন আল্লাহ তায়ালা তার রূহকে সবুজ পাখির পেটে রেখে দেন।’



ইমাম নবভী রহ: সহিহ মুসলিম শরিফের এক হাদিসের ‘রফিকুল আলা’ শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দ্বিতীয় খণ্ডের ২৮৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন : ‘কিছু মুমিনের রূহ রফিকুল আলার (উত্তম সাথী) সাথে থাকবেন। রফিকুল আলা হচ্ছেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। যাঁদের রুহ ইল্লিয়্যিনে থাকে।’



সুতরাং হাদিসের আলোকে মুমিনদের রূহ মর্যাদা অনুসারে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে। বিপরীতে কাফেরদের রূহ থাকে সিজ্জিনে। যেখানে তাদের রাখা হয় বন্দী অবস্থায়। তারা আজাবের কষ্ট অনুভব করতে থাকে। মুসনাদে আহমদে এমন একটি হাদিস রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দেন, ‘তাকে (কাফেরের রূহকে) সিজ্জিনে পৌঁছিয়ে দাও।’
লেখক : চেয়ারম্যান, উলুমুল কুরআন ফাউন্ডেশন