প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পৃথিবী ধ্বংস পূর্ব সময়ে দাজ্জালের আগমন

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পৃথিবী ধ্বংস পূর্ব সময়ে দাজ্জালের আগমন

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পৃথিবী ধ্বংস পূর্ব সময়ে দাজ্জালের আগমন
প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পৃথিবী ধ্বংস পূর্ব সময়ে দাজ্জালের আগমন


দুনিয়া নিয়ে আজকের যুগের লোকজন এত বেশি ব্যস্ত থাকে যে, কিয়ামত/পরকাল নিয়ে ভাববার ফুরসতই পায় না। কিন্তু হঠাৎ করে গত কিছুদিন ধরে ‘পৃথিবী ধ্বংস হবে’- এ নিয়ে নানা অভিমত শোনার পর মানুষের জিজ্ঞাসা ও উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতিষ যুক্তি-তর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি এ বিষয়ে রয়েছে ব্যাপক ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও পূর্বাভাস। কোরান-হাদিসের বর্ণনা মতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পূর্বে এখানে বহুমাত্রিক ও নানা অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। এখানে আবির্ভূত হবে দাজ্জাল নামের এক ভণ্ড ও জালিম। আসবেন ঈসা নবী (আ.)। নিম্নক্ত দীর্ঘ হাদিসের মাধ্যমেই সেসব বিষয়ে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করব।



সাহাবী নাওয়াস ইবনে সাময়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) ‘দাজ্জাল’ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি কখনও বিষয়টিকে অবজ্ঞার সুরে প্রকাশ করলেন আবার কখনও গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলেন। এমনকি আমাদের ধারণা হলো দাজ্জাল খেজুর বাগানের কোন এক স্থানে লুকিয়ে আছে। যখন আমরা তার কাছ থেকে ফিরে যাচ্ছিলাম তখন তিনি আমাদের প্রকৃত অবস্থা বুঝে ফেললেন।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কি হয়েছে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনি সকাল বেলা দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। আপনি তা কখনও অবজ্ঞাভাবে এবং কখনও গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করেছিলেন। এতে আমাদের ধারণা হয়েছিল সম্ভবত ওই সময়ে সে খেজুর বাগানের কোথাও অবস্থান করছে।



তখন তিনি বললেন : তোমাদের ব্যাপারে আমি দাজ্জালের ফেতনার খুব একটা আশঙ্কা করি না। যদি আমার উপস্থিতিতে সে আত্মপ্রকাশ করে তবে আমি নিজে তোমাদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াব। আর যদি আমার অবর্তমানে সে আত্মপ্রকাশ করে তবে প্রত্যেকে নিজেরাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। আল্লাহ আমার অবর্তমানে তোমাদের রক্ষক।



(এরপর মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) দীর্ঘ হাদিসে আরও বলেন) দাজ্জাল ছোট কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট একজন যুবক। তার চোখ হবে ফোলা। আমি তাকে আবদুল উয্যা ইবনে কাতানসদৃশ্য মনে করি। যে ব্যক্তি তার সাক্ষাত পাবে সে যেন ‘সূরা কাহাফে’র প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে। দাজ্জাল সিরিয়া ও ইরাকের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী রাস্তায় আত্মপ্রকাশ করবে।


সে তার ডানে ও বাঁয়ে হত্যা, ধ্বংস ও ফিতনা-ফ্যাসাদ ছড়াবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ। অটল ও স্থির হয়ে থাক। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! সে কত সময় পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে? তিনি বললেন : চল্লিশদিন। এর প্রথম একদিন হবে এক বছরের সমান (দ্বিতীয়) একদিন হবে এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের সমান।


অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের এই দিনের মতোই দীর্ঘ হবে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সে দিনের কি একদিনের নামাজই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন : না, বরং অনুমান করেই নামাজের সময় ঠিক করে নিতে হবে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে রাসূলাল্লাহ (সা.)! পৃথিবীতে দাজ্জাল কত দ্রæতগতিসম্পন্ন হবে? তিনি বললেন, ব্যথাতাড়িত মেঘের মতো দ্রæত গতিসম্পন্ন হবে।


সে এক সম্প্রদায়ের কাছে আসবে এবং তাদের নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তার প্রতি (ভয় ও বিভ্রান্ত হয়ে) ইমান আনবে এবং তার হুকুমের অনুসরণ করবে। সে আসমানকে নির্দেশ দেবে। আসমান তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে। সে জমিনকে হুকুম দেবে এবং জমিন উদ্ভিদ উৎপাদন করবে (সরল প্রাণ মানুষ তার জাদুকরী কর্মকাণ্ডে সহসাই প্রভাবিত হবে, মুমিনদের পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তার জবানে বিভ্রান্তিকর শক্তি দান করবেন)।


তার সময় মানুষের গৃহপালিত জন্তুগুলো সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবে। এগুলোর কুঁজ সুউচ্চ, দুধের বাঁটগুলো লম্বা এবং স্ফীত হবে। অতঃপর সে আরেক সম্প্রদায়ের কাছে আসবে এবং তাদের নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাদের কাছ থেকে চলে যাবে। তারা অতি দ্রæত অজন্ম ও দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হবে।


তাদের হাতে ধন-সম্পদ কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। দাজ্জাল এই বিধ্বস্ত এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলবে, তোমার গচ্ছিত সম্পদরাজি বের করে দাও। সঙ্গে সঙ্গে সে এলাকার ধন-সম্পদ মধু মক্ষিকার ন্যায় তার অনুসরণ করবে। অতঃপর সে পূর্ণ বয়স্ক এক যুবককে আহ্বান করবে।


(কিন্তু সে তাকে অস্বীকার করবে)। দাজ্জাল তাকে তরবারি দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবে। অতঃপর টুকরো দুটোকে পৃথকভাবে একটি তীরের পাল্লা পরিমাণ দূরত্বে রাখবে। অতঃপর সে ডাকবে এবং টুকরো দুটো চলে আসবে। তার চেহারা তখন প্রফুল্ল ও হাস্যময় হবে। (মানুষের ইমানী দৃঢ়তা পরীক্ষা করার জন্য কানা দাজ্জালকে এমন আজগুবি চরিত্র দিয়ে প্রেরণ করা হবে)।



ইত্যবসরে আল্লাহ তায়ালা মাসীহ ইবনে মরিয়াম আলাইহিস সালামকে পাঠাবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব অংশে সাদা মিনারের ওপরে হালকা জাফরানি (হলুদ) রঙের কাপড় পরিহিত অবস্থায় ফেরেশতাদের কাঁধে ভর দিয়ে নেমে আসবেন।


যখন তিনি মাথানত করবেন তখন মনে হবে যেন তার মাথায় মুক্তার মতো পানির বিন্দু টপকাচ্ছে। যখন তিনি মাথা উঠাবেন তখনও তার মাথা থেকে মুক্তার দানার মতো ঝরছে বলে মনে হবে। যে অবিশ্বাসীর গায়ে তার নিশ্বাস লাগবে তার বেঁেচ থাকা সম্ভব হবে না। (সঙ্গে সঙ্গে মরে যাবে)। তার দৃষ্টি যতদূর যাবে তার নিশ্বাসও ততদূর পৌঁছবে। তিনি দাজ্জালকে পিছু ধাওয়া করবেন এবং লুদ নামক স্থানে তাকে হত্যা করবেন।



অতঃপর ঈসা (আ.) ওইসব লোকের কাছে আসবেন যাদের আল্লাহ দাজ্জালের ফ্যাতনা থেকে নিরাপদ রেখেছেন। তিনি তাদের চেহারা থেকে মলিনতা দূর করে দেবেন এবং বেহেশতে তাদের যে মর্যাদা হবে তা বর্ণনা করবেন। ইত্যবসরে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন ঈসার (আ.) নিকট এই মর্মে নির্দেশ পাঠাবেন যে, আমি এমন একদল বান্দা পাঠিয়েছি যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার শক্তি কারও হবে না।


তুমি আমার এসব বান্দাকে নিয়ে তূর পাহাড়ে চলে যাও। এরপর আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ মাজুজের সম্প্রদায়কে পাঠাবেন। তারা প্রত্যেক উচ্চ ভূমি থেকে দ্রæতবেগে বেরিয়ে আসবে। তাদের অগ্রবর্তী দলগুলো তাবারিয়া হ্রদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। তারা এ হ্রদের সব পানি পান করে ফেলবে। তাদের পরবর্তী দলও এই এলাকা দিয়ে অতিক্রম করবে। তারা বলবে এখানে কোন এক সময় পানি ছিল।



আল্লাহর নবী ঈসা (আ.) ও তার সাথীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে ন। এ সময় তাদের কাছে গরুর একটি মাথা এত মূল্যবান হবে যেমন তোমরা বর্তমানে এক শ’ দীনারকে মূল্যবান মনে কর। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আ.) ও তার সঙ্গীরা (রা.) আল্লাহর কাছে কাতরভাবে প্রার্থনা করবেন।


আল্লাহ তায়ালা তাদের (ইয়াজুজ-মাজুুজ) প্রত্যেকের ঘাড়ে এক ধরনের কীট সৃষ্টি করে দেবেন। ফলে তারা সবাই একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহর নবী ঈসা (আ.) ও তার সঙ্গীগণ (রা.) পাহাড় থেকে জনপদে নেমে আসবেন। কিন্তু তারা পৃথিবীতে এক ইঞ্চি জায়গাও ইয়াজুজ-মাজুজের লাশ ও এর দুর্গন্ধ ছাড়া খালি পাবে না।



অতঃপর আল্লাহর নবী ঈসা (আ.) ও তার সঙ্গীরা (রা.) আল্লাহর কাছে কাতরভাবে প্রার্থনা করবেন। আল্লাহ তায়ালা বুখতি উটের কুঁজসদৃশ্য পাখী পাঠাবেন। এসব পাখি লাশগুলোকে আল্লাহ যেখানে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেবেন সেখানে ফেলে দেবে। অতঃপর মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ এমন বৃষ্টি পাঠাবেন যা প্রতিটি স্থান, তা মাটিরই হোক বা বালির, ধুয়ে আয়নার মতো পরিষ্কার করে দেবে।


পরবর্তীতে মাটিকে বলা হবে : তোমার ফল উৎপাদন কর এবং বরকত ফিরিয়ে নাও (এতে বরকত, কল্যাণ ও প্রাচুর্য দেখা দেবে)। একটি ডালিম খেয়ে পূর্ণ একটি দল পরিতৃপ্ত হবে এবং ডালিমের খোসাটি এত বড় হবে যে, তার ছায়ায় তারা আশ্রয় নিতে পারবে। গবাদিপশুতেও এত বরকত দেয়া হবে যে, একটি মাত্র দুধেল উটের দুধ হবে একটি বড় দলের জন্য যথেষ্ট।


একটি দুধের গাভীর দুধ একটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে এবং একটি দুধের বকরি একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট হবে। এই সময় আল্লাহ তায়ালা পবিত্র বাতাস প্রবাহিত করবেন। এই বাতাস তাদের বগলের নিচ পর্যন্ত লাগবে। ফলে সমস্ত মুমিন ও মুসলমানের রুহু কবজ হয়ে যাবে। শুধু খারাপ লোকেরাই বেঁচে থাকবে। তারা গাধার মতো প্রকাশ্যে ব্যভিচার করবে। তাদের বর্তমানেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (ইমাম মুসলিম এই দীর্ঘ হাদিসটি বর্ণনা করেন)।



বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামত নিকটবর্তী সময় যখন দাজ্জাল বের হয়ে দুনিয়ার অধিকাংশ লোককে গোমরাহ করে ফেলবে তখন হজরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করবেন। তিনি এসে মুমিন লোকদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে দাজ্জাল ও তার অনুসারীদের হত্যা করবেন। অন্য লোকদের দ্বীনে মোহাম্মদীর প্রতি দাওয়াত দেবেন এবং নিজেও ওই দীনের আইনকানুন অনুসরণ করে চলবেন।